এএসপি হত্যায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, রাজধানীর মাইন্ড এইড হাসপাতালে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম শিপন হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনার তদন্ত হচ্ছে।

দেশে অনুমোদনহীন হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চলবে বলেও এ সময় জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।

জ্যেষ্ঠ এএসপি আনিসুল করিম হত্যার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ হাসপাতালটি অনুমোদন না নিয়েই পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। হাসপাতাল পরিচালনাকারীদের পাশাপাশি অন্য কেউ জড়িত থাকলেও তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তা ছাড়া তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।’

অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অভিযান থেমে নেই। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেখানেই অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

গত সোমবার রাজধানীর মাইন্ড এইড হাসপাতালে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম শিপন নিহত হন। বর্বরোচিত এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত হত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

গতকাল রাজধানীর আদাবর থানায় আনিসুল করিম শিপনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এ ঘটনায় হাসপাতালটির ১০ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। আদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত।

মামলার এজাহারে বাদী বলেন, ‘আমার ছেলে আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার। আমার ছেলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হিসেবে কর্মরত ছিল। গত তিন-চার দিন ধরে হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়। পরিবারের সবার মতামত অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা করানোর জন্য গত ৯ নভেম্বর প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাই। অতঃপর আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য একই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আরিফ মাহমুদ জয়, রেদোয়ান সাব্বির ও ডা. নুসরাত ফারজানা আনিসুল করিমকে হাসপাতালে ভর্তির প্রক্রিয়া করতে থাকেন। ঐ সময় আমার ছেলে হাসপাতালের সকল স্টাফের সাথে স্বাভাবিক আচরণ করে। হাসপাতালের নিচতলায় একটি রুমে বসে হালকা খাবার খায়। খাবার খাওয়ার পর আমার ছেলে ওয়াশরুমে যেতে চায়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে আরিফ মাহমুদ জয় আমার ছেলেকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হাসপাতালের দোতলায় নিয়ে যায়। তখন আমার মেয়ে উম্মে সালমা আমার ছেলের সাথে যেতে চাইলে আসামি আরিফ মাহমুদ জয় ও রেদোয়ান সাব্বির বাধা দেয় এবং কলাপসিবল গেট আটকে দেয়। তখন আমি, আমার ছেলে রেজাউল করিম ও মেয়ে ডা. উম্মে সালমা (সাথী) নিচতলায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত ছিলাম। এরপর এজাহারে উল্লেখিত আসামিসহ আরো অজ্ঞাতনামা কয়েকজন আমার ছেলে আনিসুল করিমকে চিকিৎসার নামে দোতলার একটি অবজারভেশন রুমে (বিশেষভাবে তৈরি কক্ষ) নিয়ে যায়।’

এজাহারে আরো বলা হয়, ‘আসামিরা আমার ছেলেকে চিকিৎসা করার অজুহাতে অবজারভেশন রুমে মারতে মারতে ঢুকায়। তাকে উক্ত রুমের ফ্লোরে জোরপূর্বক উপুড় করে শুইয়ে তিন-চারজন হাঁটু দ্বারা পিঠের উপর চেপে বসে, কয়েকজন আমার ছেলেকে পিঠ মোড়া করে ওড়না দিয়ে দুই হাত বাঁধে। কয়েক জন আসামি কনুই দিয়ে আমার ছেলের ঘাড়ের পিছনে ও মাথায় আঘাত করে। একজন মাথার উপরে চেপে বসে এবং আসামিরা সকলে মিলে আমার ছেলের পিঠ, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্নস্থানে উপর্যুপরি কিল ঘুষি মেরে আঘাত করে। আরো বলা হয়, এরপর দুপুর ১২টার দিকে আমার ছেলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। যা হাসপাতালে স্থাপিত সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে দৃশ্যমান। নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার পর আসামি আরিফ মাহমুদ জয় নিচে এসে আমাদের ইশারায় উপরে যাওয়ার জন্য ডাক দেয়। আমি আমার ছেলে ও মেয়েসহ অবজারভেশন রুমে গিয়ে আমার ছেলেকে ফ্লোরে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পাই। অতঃপর জরুরি ভিত্তিতে আমার ছেলেকে একটি প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার পরীক্ষা করে আমার ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন।’

এজাহারে আরো বলা হয়, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার নামে অর্থ উপার্জনের একটি অনুমোদনহীন অবৈধ এবং অসৎ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। এজাহারের ১১ হতে ১৫ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত আসামিদের ব্যবস্থাপনায়, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্ররোচনায় ১ থেকে ১০ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত আসামিরাসহ তাদের কয়েকজন অজ্ঞাতনামা সহযোগী আসামিরা পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে চিকিৎসা দেওয়ার নামে অবজারভেশন রুমে নিয়ে শরীরের বিভিন্নস্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু ঘটায়।’

মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা হলেন মাইন্ড এইড হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কিচেন শেফ মো. মাসুদ, ওয়ার্ড বয় জোবায়ের হোসেন, ফার্মাসিস্ট মো. তানভীর হাসান, ওয়ার্ড বয় মো. তানিম মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, মো. লিটন আহাম্মদ ও মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ। এ ছাড়া এ মামলায় পাঁচ আসামি পলাতক রয়েছেন। তাঁরা হলেন মুহাম্মাদ নিয়াজ মোর্শেদ, মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাজ্জাদ আমিন ও মোছা. ফাতেমা খাতুন ময়না।