বিদ্রোহীদের বিষয়ে কঠোর আওয়ামী লীগ, ফিরিয়ে নিচ্ছে মনোনয়ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন তাঁরা। তবু সেই প্রার্থীদের দলীয় পদে বহাল রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এবার সেই বিদ্রোহীদের দলীয় মনোনয়নও দেয় দলটি। কিন্তু তিন দিনের মধ্যে আবার মনোনয়ন কেড়েও নিয়েছে। এমন তিন বিদ্রোহীর মনোনয়ন ফিরিয়ে নিয়ে নতুন প্রার্থী ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ।

প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ এমন ব্যবস্থা নিয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় যাঁরা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হয়েছেন বা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ।

টানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগ প্রতিবারই জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এলেই দলের নেতাকর্মীদের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দলীয় পদ থেকে বাদ দেওয়াসহ দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল। তবে এবার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে দলটি।

গত ২৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে প্রথম ধাপের ২৫টি পৌরসভায় নির্বাচনে মেয়র পদে ২৫ জনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর তিন দিনের মধ্যে তিনজনকে পরিবর্তন করে নতুন তিন প্রার্থী ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আল মাছুম মুর্শেদ শান্তর পরিবর্তে তারিকুল ইসলাম তারিককে, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায় রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দারের পরিবর্তে জাহাঙ্গীর আলম মালিককে ও নেত্রকোনার মদন পৌরসভায় মো. আব্দুল হান্নান তালুকদারের পরিবর্তে সাইফুল ইসলাম সাইফকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নৌকা প্রতীকে জয় পান খোকসা পৌরসভার বর্তমান মেয়র তারিকুল ইসলাম। নির্বাচনে আল মাছুম মুর্শেদ দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এরপর গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও আল মাছুম মুর্শেদ শান্ত নৌকার বিপক্ষে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন।

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচনে এবার প্রথমে মনোনয়ন পান স্থানীয় সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দারের ভাই ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার। গত পৌর নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক ওবায়দুর রহমান চৌধুরীর কাছে হেরে যান। মেয়র পদ হারিয়ে রিয়াজুল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন চান। কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। গত বছরের ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসাদুল হক বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হন। এ কারণেই এবার চুয়াডাঙ্গা পৌর নির্বাচনে প্রার্থী পরিবর্তন করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও চুয়াডাঙ্গা পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মালিককে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়।

এদিকে নেত্রকোনার মদন পৌরসভায় প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয় বর্তমান মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মো. আব্দুল হান্নান তালুকদারকে। আব্দুল হান্নান তালুকদার গত পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিত হন। তিনি গতবার দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় এবার তাঁকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহসম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, ‘এটা তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একটি সতর্ক বার্তা। আওয়ামী লীগ একটি শৃঙ্খল সংগঠন। যারা এ সংগঠনের নির্দেশ মানবে না, তারা কখনো দলের লোক হতে পারে না। যারা নৌকার বাইরে গিয়ে নির্বাচন করেছে বা অন্য প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে বা বিরোধিতা করেছে তাদের কখনোই আর নৌকায় চড়তে দেওয়া হবে না।’

একজন সংসদ সদস্যের ছেলে কিংবা পরিবারের লোকজনকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে সুপারিশ করে কেন্দ্রে পাঠানোর বিষয়ে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জনমানুষের দল। এখানে অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন লোক রয়েছে। আমরা সবাইকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতে পারি না। বিভিন্নজনকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হয়।’ তার পরও যদি কেউ পরিবারকেন্দ্রিক এমনটা করতে চায় তার ফল ভালো হবে না বলেও সতর্ক করে দেন কেন্দ্রীয় এ নেতা। মনোনয়ন বোর্ডও এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘যারা একবার নৌকার বিরোধিতা করেছে, তাদের আর নৌকায় চড়ানো হবে না। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। আমরা সেভাবেই কাজ করছি।’